সয়াবিন তেলের দাম বাড়ল কেন
সয়াবিন তেলের দাম বাড়ল কেন
দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি বাংলাদেশে একটি নিয়মিত বিষয়। বিগত কয়েক মাসে সয়াবিন তেলের দাম অনেক বেড়েছে। সরকার বলছে ভোজ্য তেলের কোন ঘাটতি নেই। ডিলারদের কারসাজিতে বাজারে সয়াবিন তেলের ‘কৃত্রিম সংকট’ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ বিশ্বের তৃতীয় শীর্ষ সয়াবিন তেল আমদানিকারক দেশ। দেশের সয়াবিন তেলের চাহিদার সিংহভাগই আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হয়। কিন্তু বিগত কয়েক মাসে সয়াবিন সহ ভোজ্য তেলের বিশ্ব বাজার এক ধরনের অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সয়াবিন তেল রপ্তানি করে আর্জেন্টিনা। সমগ্র বিশ্বের প্রায় অর্ধেক সয়াবিন তেল আর্জেন্টিনা থেকেই আসে। কিন্তু গত বছর উষ্ণ তাপমাত্রা ও খরার কারণে আর্জেন্টিনায় কাঙ্খিত পরিমাণ সয়াবিন উৎপাদন হয়নি। এছাড়া বর্তমানে আর্জেন্টিনার সরকার ঋণে জর্জরিত। তাই তারা সয়াবিন বিক্রি থেকে দেশের রাজস্ব বাড়াতে মনোযোগী হয়েছে। এ জন্য আর্জেন্টিনার সরকার সয়াবিন রপ্তানির ওপর শুল্ক বাড়াতে চায়। তাছাড়া বিদেশি ক্রেতাদের কাছে সয়াবিন পণ্য বিক্রিও সীমিত রাখার কথা বলা হয়েছে। আর্জেন্টিনার প্রতিবেশী দেশ ব্রাজিল এবং দক্ষিণ আমেরিকার অন্যান্য দেশেও খরার কারণে সয়াবিন উৎপাদন কমে গেছে। আর তার প্রভাবে রাতারাতি বিশ বাজারে ভোজ্য তলের দাম বেড়ে গেছে।
সয়াবিন তেলের বিকল্প হিসেবে অনেক ক্ষেত্রেই পাম অয়েল ব্যবহার করা হয়। সাধারণত বানিজ্যিক ভাবে খাদ্য পণ্য উৎপাদনে পাম অয়েলের ব্যবহার বেশি। কিন্তু সেই পাম অয়েলের বাজারেও একটি বড় ধাক্কা আসার কারণে, তার বাড়তি চাপ পড়েছে সয়াবিন তেলের বাজারে। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি পাম তেল উৎপাদনকারী দেশ ইন্দোনেশিয়া। কিছু দিন আগে ইন্দোনেশিয়াও পাম তেল রপ্তানির উপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। তার পর থেকে বিশ্ববাজারে পাম তেলের দাম ২২ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। ইন্দোনেশিয়ার পামতেল রপ্তানির নিষেধাজ্ঞা দেয়ার পর থেকে সয়াবিনের দাম টনপ্রতি ১৭ হাজার টাকা বেড়েছে। সয়াবিন তেলের আরেকটি জনপ্রিয় বিকল্প হল সূর্যমুখী তেল। বিশ্বের সূর্যমুখী তেলের অন্যতম উৎস হল রাশিয়া ও ইউক্রেন। দেশ দুটি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার কারণে, সূর্যমুখী তেল ব্যবহারকারী দেশ গুলোতে ভোজ্য তেলের সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে সয়াবিন তেল ব্যবহার শুরু করেছে। সেকারণেও সয়াবিন তেলের বাড়তি চাহিদা তৈরী হয়েছে। যা বৈশ্বিক সয়াবিন তেলের সংকট আরো বৃদ্ধি করেছে।
বিশ্ব বাজারে ভোজ্য তেলের নানা রকম অস্থিরতার কারণে বাংলাদেশেও সয়াবিন তেলের দাম বেড়েছে। বাংলাদেশের মানুষও বাড়তি দামে সয়াবিন তেল কিনতে বাধ্য হচ্ছে। এই পর্যন্ত ঘটনাগুলো ঠিকই ছিল, কিন্তু সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে, বাংলাদেশের অতি মুনাফা লোভী সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের কারণে। বৈশ্বিক নানান ইস্যু থাকলেও দেশে সয়াবিন তেলের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। বাংলাদেশে প্রতি মাসে সয়াবিন তেলের চাহিদা প্রায় এক লক্ষ টন। গত বছরের হিসেব মতে, প্রতি মাসে গড়ে ৬৫ হাজার টন সয়াবিন আমদানি করা হয়। এই তেলের তিন থেকে চার শতাংশ জাহাজ থেকে খালাস, পরিবহন ও পরিশোধন পর্যায়ে অপচয় হয়। এছাড়া দেশে প্রতি মাসে প্রায় ২৮ হাজার টন সয়াবিন তেল উৎপাদিত হয়। তারমানে আমদানি এবং উৎপাদন মিলিয়ে বাংলাদেশে সয়াবিন তেলের সংকট থাকার কথা নয়। কিন্তু হতাশার বিষয় হল, দেশে ভোজ্যতেলের পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও, হঠাৎ করেই বাড়তি দাম দিয়েও ক্রেতারা বাজারে সয়াবিন তেল পাচ্ছে না। অনেক জায়গায় আগের মজুদ কৃত সয়াবিন তেল অধিক দামে বিক্রি করা হচ্ছে। অথচ মজুদাররা সেই তেল গুলো কিনেছিল বিশ্ব বাজারে কয়েক দফা দাম বাড়ার আগে।