জাপানের জনসংখ্যা সমস্যা

maxresdefault 79
জীবনযাপন

জাপানের জনসংখ্যা সমস্যা

বিগত কয়েক দশক ধরেই জাপানের জনসংখ্যা কমেই চলেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে জাপানের জনসংখ্যা হ্রাসকে একটি বিপদ সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। জাপানে সন্তান লালন পালন করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। সেকারণে দেশটিতে সন্তান গ্রহণের হার আশঙ্কাজনক হারে কমেছে। এছাড়া জাপানের তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার বিষয়েও অনাগ্রহী। সেকারণে ভবিষ্যতেও জাপানের জনসংখ্যা স্বাভাবিক হবার সম্ভাবনা খুবই কম। একদিকে শিশু জন্মের হার কমছে, অন্যদিকে বিপুল পরিমাণ বৃদ্ধ জনগোষ্ঠী দেশটির বোঝায় পরিণত হচ্ছে। সবমিলিয়ে জাপানের অর্থনীতি সচল রাখার মত পর্যাপ্ত জনশক্তির বিশাল ঘাটতি দেখা যাচ্ছে।

জাপানের তরুণ প্রজন্ম বিয়ে করতে চায় না কেন ?

উনিশ এবং বিশ শতকের শুরুর দিকে জাপানের জনসংখ্যার দ্রুত বৃদ্ধি ঘটে। তবে দেশটির জন্মহার কমতে শুরু করেছিল ১৯৭০ এর দশক থেকে। এবং সামগ্রীক জনসংখ্যা কমার ধারা শুরু হয়েছিল ২০০৫ সালে। ২০০৮ সালেও জাপানের জনসংখ্যা ছিল ১২ কোটি ৭৭ লক্ষ। তখন জাপান বিশ্বের দশম জনবহুল দেশ ছিল।  জাপানের বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় সাড়ে ১২ কোটি ৫৭ লক্ষ। ১৯৫০ সালের পর চলতি বছরে জনসংখ্যার সবচেয়ে বড় পতন ঘটেছে। জাপানের জনসংখ্যা হ্রাসের জন্য মোটা দাগে ৫টি বিষয়কে দায়ী করা হয়। বিষয়গুলো হল: ১. বয়স্ক জনসংখ্যা ২. জন্মহার হ্রাস ৩. মূল্যবোধের পরিবর্তন ৪. লিঙ্গ বৈষম্য এবং ৫. অভিবাসন বিধিনিষেধ। ২০১২ সালে করা জাপানের National Institute of Population and Social Security Research অনুযায়ী, প্রতিবছর জাপানের জনসংখ্যা প্রায় দশ লক্ষ করে কমতে থাকেব। সেই হিসেবে ২১১০ সালে জাপানের জনসংখ্যা হবে মাত্রা চার কোটি ২০ লক্ষ।

বয়স্ক জনসংখ্যা

প্রথমেই জাপানের বয়স্ক জনসংখ্যা নিয়ে আলোচনা করা যাক। জাপান বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বয়স্ক জনসংখ্যার দেশ। জাপানে অবসর গ্রহনের বয়স ৬৫ বছর। বর্তমানে এই দেশের জনসংখ্যার প্রায় তিন ভাগের এক ভাগ লোকের বয়স ৬৫ বছরের উপরে। অর্থাৎ দেশের তিদন ভাগের এক ভাগ লোকই কর্মক্ষেত্র থেকে অবসর প্রাপ্ত। আগামী ২৫ বছরের মধ্যে দেশের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক লোকের বয়স হবে ৬৫। তখন জাপান বুড়ো মানুষের দেশে পরিণত হবে। সেকারণে জাপানে অবসর গ্রহণের বয়স ৭০ করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। ২০২৫ সালে জাপানের জনসংখ্যার ১৫ শতাংশই হবে ৬৫ থেকে ৮৫ বছর বয়সী।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সীদের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৭ কোটি, যা মোট জনসংখ্যার ৫৯ দশমিক ৫ শতাংশ। অন্যদিকে ৬৫ এর ওপরে যাঁদের বয়স, তাঁদের আনুপাতিক হার হচ্ছে ২৮ দশমিক ৪ শতাংশ। ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সসীমার কর্মক্ষম জনসংখ্যা দ্রুত কমার পাশাপাশি ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের সংখ্যা বাড়তে থাকা; জাপানের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগজনক।

জাপানের মানুষের গড় আয়ু ৮১ বছরের বেশি। সেকারণে জাপানই বিশ্বের সবচেয়ে বেশি গড় আয়ুর দেশ। শুধু তাই নয় সবচেয়ে বেশি শতায়ু মানুষও রয়েছে জাপানে। এমনকি এই সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে। ৩০ বছর আগে জাাপানে ১০০ বছরের বেশি বয়স্ক মানুষের সংখ্যা ছিল মাত্র ৩ হাজার। তিন দশকের ব্যবধানে শতায়ু মানুষের সংখ্যা বেড়েছে ২৩ গুণ। বর্তমানে জাপানে ৭১ হাজারেরও বেশি শতবর্ষী মানুষ রয়েছে। শতায়ুদের মধ্যে নারীর সংখ্যা পুরুষের চেয়ে অনেক বেশি। ৭১ হাজার ২৩৮ জন শতায়ু ব্যক্তির ৮৮ দশমিক ১ শতাংশই নারী।

এই বয়সের লোকজন হলেন পেনশনভোগী এবং এঁদের স্বাস্থ্যসেবার জন্য মোটা অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হয় সরকারকে। ফলে করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ার পরও খরচ মেটাতে সরকারকে ঋণ নিতে হচ্ছে।

জন্মহার হ্রাস ও মূল্যবোধের পরিবর্তন

১৯৭০ এর দশক থেকে শুরু হয়ে এখনও পর্যন্ত জাপানের জন্মহার কমেই চলেছে। বর্তমানে নারী প্রতি গড় শিশুর হার ১.৩৬। কিন্তু জাপানের জনসংখ্যার সামঞ্জস্য বজায় রাখতে হলে নারী প্রতি শিশুর হার হতে হবে ২.১। তারমানে বয়স্ক জনসংখ্যা নতুন জনসংখ্যা দ্বারা প্রতিস্থাপিত হচ্ছে না।

জাপানের সরকারি হিসাব অনুযায়ী, গত বছর দেশটিতে জন্মহার কমে যাওয়ার নতুন রেকর্ড হয়। গত বছর সরকারের প্রত্যাশার চেয়েও আট লাখ কম শিশুর জন্ম হয়েছে দেশটিতে। ২০১৩ সালের একটি জরিপে দেখা যায় যে, জাপানের জনসংখ্যার তিন ভাগের এক ভাগ লোক বিয়ে করা এবং বিয়ে করে সন্তান জন্ম দানের কোন অর্থই খুঁজে পান না। জরিপে আরো দেখা যায়, ৩৮ শতাংশ কিশোর কিশোরী এবং ৩০ এর কোঠায় পা রাখা ৪০ শতাংশ মানুষের বিয়ে করার কোন ইচ্ছে নেই। একা একা জীবন পার করে দেওয়ার মত এই ধরনের মানসিকতা পশ্চিমা বিশ্বে Lone Wolf Philosophy নামে পরিচিত। কিন্তু জাপানীদের Lone Wolf Philosophy পশ্চিমাদের চেয়েও অনেক বেশি জটিল। জাপানি ভাষায় এই বিষয়টিকে বলা হয় সেক্কুসু সিনাই সকুগুন। এর অর্থ হল এক ধরনের ব্রহ্মচর্য জীবন, যার মাধ্যমে বোঝানো সেই সব জাপানী তরুণদেরকে বোঝানো হয়, যারা সকল ধরনের রোমান্টিক সম্পর্ক এবং যৌন আকাঙ্খা হারিয়ে ফেলেছে। ২০১১ সালের আরেক জরিপে দেখা যায়, জাপানের অবিবাহিত ৬১ শতাংশ পুরুষ এবং ৪৯ শতাংশ নারী কোন ধরনের সম্পর্কে জড়িত নয়। এই ধরনের মানসিকতা যাদের নেই, তাদেরও অনেকে বিপরীত লিঙ্গের প্রতি খুব বেশি আগ্রহী নয়, এবং তারা সমকামীও নয়। এরা ভার্চুয়াল রিয়ালিটি সঙ্গী এবং যৌন পুতুলের উপর নির্ভরশীল। জাপানের বর্তমান জনসংখ্যার এই ধরনের মূল্যবোধের পরিবর্তনকেই, দেশটির জন্মহার কমার পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

এছাড়া দেশটিতে লৈঙ্গিক সমতার অভাবের কারণে, পারিবারিক জীবনে নারীরা এখনও নিজের মত কাজ করা সহ অনেক ক্ষেত্রেই বাঁধার সম্মুখীন হন। যা নারীদের সন্তান ধারণে নিরুৎসাহিত করে। সেকারণে অনেক নারী বিয়ে করে সংসার করার বদলে, নিজের ক্যারিয়ার গড়ে তোলাকেই প্রাধান্য দেয়।

জাপান সরকার কয়েক বছর ধরেই জন্মহার বাড়াতে জনগণকে নানা উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছে। বেশি সন্তান নিলে নগদ অর্থসহ নানা সুবিধার ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে। তবে সমীক্ষা অনুযায়ী, শিশুর লালনপালনের ক্ষেত্রে বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল দেশগুলোর একটি জাপান। এ কারণে অনেকেই সন্তান নিতে চান না। জাপানের ইউওয়া পপুলেশন রিসার্চ অনুসারে, শিশু লালনপালনের ক্ষেত্রে জাপান বিশ্বের তৃতীয় ব্যয়বহুল দেশ। এই তালিকায় শীর্ষে আছে চীন,, তারপর দক্ষিণ কোরিয়া। এ দুটি দেশেও জনসংখ্যা কমছে। জাপানের প্রধানমন্ত্রী ফুমিও কিশিদা শিশু পালনবিষয়ক সমস্যা তদারকি করার জন্য একটি নতুন শিশু ও পরিবার বিষয়ক সরকারি সংস্থা গড়ে তোলা ঘোষণা দিয়েছেন।

অভিবাসন বিধিনিষেধ

জাপানে ঐতিহ্যগতভাবেই অভিবাসন নীতি অত্যন্ত কঠোর। এর ফলে বিদেশী কর্মী এবং অভিবাসীর সংখ্যা অনেক সীমিত। বর্তমানে জাপানে ভূমিপুত্র জাপানিদের সংখ্যা কমলেও বিদেশিদের সংখ্যা বাড়ছে। এক বছর আগেও জাপানে বিদেশী জনসংখ্যা ছিল ২২ লাখ ২৯ হাজার। বর্তমানে জাপানে প্রায় ২৪ লাখ ৪০ হাজার বিদেশী রয়েছে। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ২ লাখ ১১ হাজার বিদেশী বেড়েছে। এই বৃদ্ধির পেছনে রয়েছে গত বছর চালু হওয়া নতুন ভিসা নীতি। এই ভিসা ব্যবস্থায় বিদেশী শ্রমজীবি মানুষদের জাপানে আসা সহজ করা হয়েছে। কারণ জাপানের অবসরপ্রাপ্ত কর্মী বাহিনীকে প্রতিস্থাপন করার মত পর্যাপ্ত তরুণ জনগোষ্ঠী নেই।

শহরমূখী জনসংখ্যা

জাপান মূলত একটি নগর ভিত্তিক রাষ্ট্র। জাপানের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯১ শতাংশ লোক শহরে বাস করে। এর কারণ হল জাপানের মোট ভূখন্ডের ৭৫ শতাংশই হল পার্বত্য অঞ্চল এবং দেশটির মোট আয়তনের ৬৮ শতাংশই বনভূমি। দেশের মোট জনসংখ্যার মাত্র ৪% কৃষিকাজে নিয়োজিত।

জাপানের ৪৭টি জেলার মধ্যে ৪০টিতে জনসংখ্যা হ্রাস পেলেও বড় আকারের শহর রয়েছে সে রকম ৭টি জেলায় জনসংখ্যা বেড়েছে। তারমানে জাপানের মফস্বল এলাকা থেকে তরুণ প্রজন্মের লোকজন শহরে চলে আসছে। জাপানের রাজধানী টোকিও বিশ্বের সবচেয়ে বড় মেগা সিটি। এখানে প্রায় প্রায় ১ কোটি ৩০ লক্ষ বাস করে। তবে টোকিও থেকে ইয়োকোহামা পর্যন্ত বিশাল অঞ্চল জুড়ে অবিচ্ছিন্নভাবে বিশাল জনবসতি রয়েছে। সেকারণে এই এলাকাকে একটি মহানগর হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যার মোট জনসংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ৮০ লক্ষ।

টোকিও এবং ইয়োকোহামা ছাড়াও অন্যান্য জনবহুল শহরগুলোতেও বিপুল সংখ্যক মানুষের বসতি রয়েছে। ওসাকা শহরে ২৬ লক্ষ, নাগোয়্যা শহরে ২২ লক্ষ, সাপ্পোরো শহরে ১৮ লক্ষ, কিয়োতো শহরে ১৫ লক্ষ, কোবে শহরে ১৫ লক্ষ, কাওয়াসাকি শহরে ১৪ লক্ষ, ফুকুওকা শহরে ১৪ লক্ষ এবং সাইতামা শহরে ১২ লক্ষ লোক বাস করে। শহরাঞ্চলের জনসংখ্যা যত বৃদ্ধি পাচ্ছে, ততই মানুষের একাকীত্ব এবং ব্রহ্মর্য জীবন যাপন বাড়ছে। সেই সাথে জাপানের গ্রামীণ অর্থনীতি ভেঙে পড়ছে। বিপুল পরিমাণ জনসংখ্যাকে শহর থেকে আবারো গ্রামে ফেরাতে, সরকারী একটি প্রনোদনার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কোন পরিবার যদি শহর ছেড়ে গ্রামে গিয়ে ৫ বছর বসবাস করে, তাহলে তাদেরকে আর্থিক সহ নানা ধরনের সুযোগ সুবিধা প্রদান করা হয়।

Leave your thought here

Your email address will not be published. Required fields are marked *


দিন
ঘণ্টা
মিনিট
সেকেন্ড
আমাদের লাইভ ক্লাস শেষ হয়েছে, তবে আপনি এখন ফ্রি রেকর্ডেড কোর্সে ইনরোল করে দেখতে পারবেন।
আপনার রেজিস্ট্রেশন সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।

আপনার জন্য একটি একাউন্ট তৈরি হয়েছে। প্রদত্ত ইমেইল ও পাসওয়ার্ড দিয়ে লগইন করুন।

কোর্সের তারিখ: ০৩/১০/২০২৫
সময়: রাত ৯টা থেকে
(বাংলাদেশ সময়)

আপনার সঠিক - নাম, ইমেইল দিয়ে
Sign Up এ ক্লিক করুন।