হলুদ সাংবাদিকতা

maxresdefault (64)
জীবনযাপন

হলুদ সাংবাদিকতা

সাম্প্রতিক সময়ে জনপ্রিয় একটি দৈনিক পত্রিকার সংবাদ ছবিকে কেন্দ্র করে হলুদ সাংবাদিকতা শব্দটি বারবার উঠে আসছে। কিন্তু আমরা অনেকেই হয়ত জানি না হলুদ সাংবাদিকতার অর্থ কী।

আমাদের ব্যবহৃত আর দশটি সাধারণ পণ্যের মতই, সংবাদও একটি পণ্য। অতীতে সংবাদ এর বাজার এত জনপ্রিয় ছিল না। সংবাদকে জনপ্রিয় পণ্যে পরিণত করার ইতিহাসের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে হলুদ সাংবাদিকতা। সংবাদের বস্তুনিষ্ঠতার পরিবর্তে নজরকাড়া শিরোনাম দিয়ে, উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে ভিত্তিহীন রোমাঞ্চকর সংবাদ পরিবেশনই হলুদ সাংবাদিকতা’। সংবাদিকতার দুই মহারথি; জোসেফ পুলিৎজার ও উইলিয়াম রান্ডলফ হার্স্ট; তাদের পত্রিকার কাটতি বাড়ানোর জন্য ভিত্তিহীন, অর্ধসত্য ও নানা ধরনের মনগড়া খবর ছাপানোর এক অসুস্থ প্রতিযোগীতায় লিপ্ত হয়েছিল। তাদের সেই প্রতিযোগীতারই ফসল হলুদ সাংবাদিকতা।

হলুদ সাংবাদিকতা মানে কি ?

সংবাদপত্র বেশকিছু বৈপ্লবিক পরিবর্তনের মাধ্যমে আজকের পর্যায়ে এসেছে। উনিশ শতকে আমেরিকায় শুরু হওয়া এই বিপ্লবের নেপথ্যে ছিলো সংবাদপত্র ইতিহাসের দুই অবিসংবাদিত নেতার দ্বৈরথ। হাঙ্গেরী থেকে অভিবাসী হয়ে আমেরিকায় আসা জোসেফ পুলিৎজারের শৈশব কেটেছে অত্যন্ত দীনতায়। কিশোর বয়সে রাস্তায় রাস্তায় পত্রিকা বিক্রি করা আর মানুষের দুঃখ দুর্দশাকে কাছ থেকে দেখা পুলিৎজারের স্বপ্ন ছিলো নিজের একটি পত্রিকা বের করার। সেখানে তিনি দরিদ্র মানুষের সংগ্রামের কথা লিখবেন এই ছিলো তার সংকল্প। সেইন্ট লুইস পত্রিকায় পুলিৎজার প্রথম সাংবাদিকতার সুযোগ পান। সঠিক তথ্য যথাযথ উপস্থাপনের মাধ্যমে সমাজের উঁচু শ্রেণীর মানুষ ও রাজনীতিকদের দূর্নীতি প্রকাশ করে পুলিৎজার অল্পদিনেই সংবাদপত্র জগতে পরিচিতি পেয়ে যান। তার অল্প দিনের মধ্যেই সেইন্ট লুইস পোস্ট ডিসপ্যাচ  নামের একটি পত্রিকার মালিক হন তিনি।

১৮৮৩ সালে পুলিৎজার সংবাদপত্রের জন্যে বিখ্যাত নগরী নিউ ইয়র্ক সিটিতে পাড়ি জমান এবং নিউ ইয়র্ক ওয়ার্ল্ড নামের একটি পত্রিকা কিনে নেন। সেসময় নিউ ইয়র্কে প্রচুর অভিবাসী এসে বেকারত্ব ও দুর্দশায় জীবন কাটাচ্ছিলো। একই অবস্থা থেকে উঠে আসা পুলিৎজার চাচ্ছিলেন এই অভিবাসী ও শ্রমজীবীদের জীবনের খবর প্রকাশ করে তিনি পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবেন। সেসময় সংবাদপত্রে শুধু সমাজের উঁচু স্তরের মানুষের খবর ছাপা হতো। বেশির ভাগ পত্রিকাই ছিলো রাজনৈতিক দল দ্বারা প্রভাবিত। এছাড়া তখনকার সংবাদপত্রগুলোও ছিল খুবই বিরক্তিকর ও একঘেয়ে। কারণ তৎকালীন সংবাদপত্রে কোন শিরোনামই থাকত না এবং সকল সংবাদ একই সাইজের হরফে ছাপা হতো। পুলিৎজার তাঁর পত্রিকায় সর্বপ্রথম হেডলাইন, নতুন হরফ, বোল্ড, টাইপেগ্রাফি ইত্যাদির প্রবর্তন করেন। এর মাত্র ৬ মাসের মধ্যেই পুলিৎজারের পত্রিকা নিউ ইয়র্ক ওয়ার্ল্ড এর গ্রাহক তিন গুণ বেড়ে গিয়ে ৪৫ হাজারে পৌছায় এবং দেড় বছরের মাথায় এক লক্ষ গ্রাহক তার পত্রিকা পড়তে শুরু করে। আর এভাবেই পুলিৎজারের দৃঢ় সংকল্প আর সাহসী পদক্ষেপ তাকে নিউইয়র্কের অন্যতম প্রভাবশালী মানুষে পরিণত করে।

নিউইয়র্র্ক থেকে ২০০ মাইল দূরে ম্যাসাচুসেটস এর কেমব্রিজে বসে, পুলিৎজারের এই উত্থান সূক্ষ দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করছিলেন উইলিয়াম রান্ডলফ হার্স্ট। ধনী পরিবারের প্রাচুর্যে বেড়ে ওঠা হার্স্ট ছোটোবেলা থেকেই ছিলেন উচ্চাভিলাষী। সংবাদপত্র ব্যবসায় আগ্রহী হার্স্ট ১৮৮৭ সালে তার পিতার মালিকানাধীন পত্রিকা সান ফ্রান্সিস্কো একজামিনার এর দায়িত্ব নেন। নিম্ন মানের খবর এর জন্য পত্রিকাটি খুবই খারাপ অবস্থা চলছিল। পুলিৎজারের কৌশল অবলম্বন করে হার্স্ট তার পত্রিকাকে নতুন রূপ দেন। কিন্তু তিনি তাঁর পত্রিকায় মিথ্যা ও ভুঁয়া তথ্য দিয়ে মুখরোচক খবর ছাপতে থাকেন, যা আমরা বর্তমান সময়ে হলুদ সাংবাদিকতা হিসেবে জানি। সান ফ্রান্সিস্কো একজামিনার অল্পকিছুদিনেই গ্রাহকপ্রিয়তা লাভ করে। এরপর হার্স্ট নিউ ইয়র্কে আসেন তার আদর্শ গুরু পুলিৎজারের সাথে প্রতিযোগীতা করতে।

পুলিৎজার এবং হার্স্টের মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য ছিলো-

          পুলিৎজার ক্ষমতার প্রতি আগ্রহী ছিলেন একটি বিশেষ পরিবর্তনের লক্ষ্যে। তিনি চেয়েছেন সমাজের খেটে খাওয়া মানুষকে তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করতে।

          অন্যদিকে হার্স্ট এর ক্ষমতার প্রতি আগ্রহ ছিলো শুধু মাত্র আত্ম উন্নয়ন এবং নিজেকে প্রভাবশালী করার লক্ষ্যে।

হার্স্ট নিউ ইয়র্কে এসে নিউ ইয়র্ক মর্নিং জার্নাল নামের একটি সস্তা পত্রিকা কিনে নেন। ঠিক সেই সময়ে পুলিৎজার নিউইয়র্কের বাইরে অবস্থান করায়, সুযোগ সন্ধানী হার্স্ট মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে পুলিৎজারের পত্রিকার সেরা কর্মীদেরকে নিজের পত্রিকায় নিয়ে আসেন। তাঁর পত্রিকার নতুন নাম হয় নিউ ইয়র্ক জার্নাল। উইলিয়াম হার্স্টের পত্রিকার প্রথম পাতার হেডলাইন গুলো ছিলো অপরাধ ও স্ক্যান্ডাল জাতীয় সংবাদে ভরপুর। এরফলে মাত্র তিন মাসে হার্স্ট এর পত্রিকা দ্বিগুন গ্রাহক অর্জন করে। প্রতিযেগীতায় এগিয়ে থাকতে হার্স্ট তাঁর পত্রিকার দামও কমিয়ে দেন। পুলিৎজারের ৮ পৃষ্ঠার পত্রিকা নিউ ইয়র্ক ওয়ার্ল্ড এর বিক্রয় মূল্য ছিল ২ সেন্ট। অন্যদিকে হার্স্ট তার ১৬ পৃষ্ঠার নিউ ইয়র্ক জার্নাল বিক্রি করত মাত্র ১ সেন্টে। এরফলে পুলিৎজার তাঁর পত্রিকার গ্রাহক হারাতে শুরু করে। পুলিৎজার হার্স্ট এর ধূর্ততায় মানসিক ভাবে অত্যন্ত আহত হন। হার্স্টের নিত্য নতুন কৌশলের কাছে পুলিৎজার ও তাঁর পত্রিকা বারবার ধরাশয়ী হতে থাকে।

তৎকালীন সময়ে সাংবাদিকেরা তারকাদের সম পর্যায়ে ছিলেন। এই তারকারা পত্রিকার পাতায় কি লিখছেন তা জানার জন্যেই আগ্রহী পাঠকেরা নিয়মিত সংবাদপত্র কিনতো। পুলিৎজারের পত্রিকায় কাজ করা তৎকালীন সময়ের অন্যতম সেরা সাংবাদিক ছিলেন আর্থার ব্রিসবেন এবং রিচার্ড ফেন্টো। রিচার্ড ফেন্টো  ছিলেন একজন কার্টুনিস্ট। তিনি নিউইয়র্ক ওয়ার্ল্ডের প্রথম পাতায় ইয়েলো কিড বা হলুদ বালক নামে প্রতিদিন একটি কার্টুন আঁকতেন। এই কার্টুনের মাধ্যমে পুলিৎজার সামাজিক অসংগতি থেকে শুরু করে এমন অনেক কিছু বলিয়ে নিতেন, যা ছিল অনেকটাই পক্ষপাতদুষ্ট। পুলিৎজারের পত্রিকার এই দুই তারকা সাংবাদিক কে অধিক বেতনের প্রলোভনে হার্স্ট তার নিজের পত্রিকায় নিয়ে আসেন। তখন পুলিৎজার বাধ্য হয়ে জর্জ লুকাস নামে আরেক কাটুনিস্টকে নিয়োগ দেন। এরপর থেকে উভয় পত্রিকাতেই ইয়োলো কিডস কার্টুন ছাপা হতে লাগলো। এর মাধ্যমে শুরু হয়ে গেলো পত্রিকার কাটতি নিয়ে দুটো পত্রিকার মধ্যে প্রত্যক্ষ দ্বন্দ। এই ইয়োলো কিডস কার্টুনের মাধ্যমে ছাপা হওয়া ভিত্তিহীন, অর্ধসত্য, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংবাদ তখন থেকে ইয়োলো জার্নালিজম বা হলুদ সাংবাদিকতা হিসেবে পরিচিতি পেতে থাকে। এর ফলে তৈরী হয় নষ্ট মানসিকাতা সম্পন্ন এক পাঠকশ্রেণি, যারা সব সময় চটকদার, ভিত্তিহীন, চাঞ্চল্য সৃষ্টিকারী, অর্ধ-সত্য সংবাদ প্রত্যাশা করতো এবং তা পাঠ করে তৃপ্তি পেতো।

১৮৯৮ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারী কিউবার হাভানায় নোঙর ফেলা একটি ইউএসএস মেরিন জাহাজে আকস্মিক বিস্ফোরণে প্রায় আড়াইশ জন আমেরিকান নাবিক মারা যায়। হার্স্ট তাঁর পত্রিকায় এই দূর্ঘটনা কে স্পেন এর ষড়যন্ত্র আখ্যা দিয়ে ভুয়া তথ্যের সাহায্যে পত্রিকায় খবর প্রকাশ করেন। চাঞ্চল্যকর সেই ভুয়া সংবাদ প্রকাশের দুই মাসের মাথায় ১৮৯৮ সালের ২৫ এপ্রিল, আমেরিকান কংগ্রেস স্পেন এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করে। তখন বাাজরে টিকে থাকার লড়াইয়ে পুলিৎজারও হার্স্ট এর মতো ভুয়া সংবাদ প্রকাশ করতে শুরু করে। স্প্যানিস-আমেরিকান যুদ্ধ পুলিৎজার ও হার্স্ট উভয়ের জন্যেই তাদের পত্রিকা বিক্রির একটি লাভজনক বাজার সৃষ্টি করেছিল। এ যুদ্ধের সময়ই হার্স্টের পত্রিকার নিয়মিত গ্রাহক সংখ্যা ১০ লক্ষ ছাড়িয়ে যায়।

তৎকালীন সময়ে দৈনিক পত্রিকা গ্রাহকের কাছে পৌছে দিত পথশিশুরা; তাদের বলা হত নিউজি, অনেকটা আমাদের দেশের শিশু হকারদের মত। যুদ্ধকালীন সময়ে নিউজি রা ১০০ টি পত্রিকা কিনত ৫০ সেন্ট মূল্যে। স্প্যানিস-আমেরিকান যুদ্ধের পর পুলিৎজার ও হার্স্ট অবিক্রিত পত্রিকার জন্যে মূল্য ফেরত ব্যবস্থা বাতিল করা সহ নিউজিদের কাছে বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ করে ৬০ সেন্ট। এর প্রতিবাদে নিউ ইয়র্কের পথশিশুরা দুই ক্ষমতাধর পত্রিকার বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে। যার ফলে পত্রিকার সম্পূর্ণ বিলিব্যবস্থাই বন্ধ হয়ে যায়। দুই প্রভাবশালী পত্রিকার ব্যবসা তাদের মালিকের নিষ্ঠুরতার জন্যে আচমকা হুমকির মুখে পড়ে যায়। একপর্যায়ে পুলিৎজার তার কৃৎকর্মের জন্যে অনুশোচনায় ভুগতে থাকেন কারণ তিনি নিজেও একসময় নিউজি ছিলেন। অবশেষে দু’জনেই অবিক্রিত পত্রিকার জন্যে নিউজি দের টাকা ফেরত দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিলে ১৮৯৯ সালের ২ আগস্ট ধর্মঘট শেষ হয়।

সততার সাথে সংবাদ প্রকাশ করে সুখ্যাতি লাভ করা পুলিৎজার, অর্থ উপার্জনের মোহে র‌্যান্ডলফ হার্স্টের সাথে জঘন্য এক প্রতিযোগীতায় লিপ্ত হন। পরবর্তীতে পুলিৎজার তার কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হয়ে নিউ ইয়র্কের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ২ মিলিয়ন ডলার দান করেন। এখানেই সর্বপ্রথম সাংবাদিকতা বিষয়ক শিক্ষাদান শুরু হয়। এবং সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণের প্রধান ক্ষেত্র হয়ে ওঠে কলম্বিয়া স্কুল অব জার্নালিজম। ১৯১১ সালের ২৯ অক্টোবর পুলিৎজারের মৃত্যুর পর থেকে তার সম্মানে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় পুলিৎজার পুরস্কার প্রবর্তন করে। যা এখনও পর্যন্ত সাংবাদিকতার সর্বোচ্চ পুরষ্কার হিসেবে স্বীকৃত। অপ-সাংবাদিকতার অর্থ দিয়েই বর্তমানে শ্রেষ্ঠ সাংবাদিকদের পুরষ্কার দেওয়া হয়।

অপরদিকে রান্ডলফ হার্স্ট রাজনীতিতে মনোনিবেশ করেন এবং একসময় হলিউডে প্রতিষ্ঠিত হন। রান্ডলফ হার্স্ট এর জীবনী নিয়ে অরসন ওয়েলস নির্মান করেন হলিউডের সর্বকালের অন্যতম সেরা চলচিত্র সিটিজেন কেইন। পুলিৎজার এবং হার্স্ট এর তিক্ত লড়াইয়ের মাঝে সাংবাদপত্র শিল্পের অভূতপূর্ব বিপ্লব সাধিত হয়। আজকে আমরা যে আধুনিক গণমাধ্যম ব্যবস্থা দেখছি, এই রূপরেখার অনেকটাই গড়ে উঠেছে এই দুই মহারথির দ্বৈরথের মধ্য দিয়ে।

Leave your thought here

Your email address will not be published. Required fields are marked *


দিন
ঘণ্টা
মিনিট
সেকেন্ড
আমাদের লাইভ ক্লাস শেষ হয়েছে, তবে আপনি এখন ফ্রি রেকর্ডেড কোর্সে ইনরোল করে দেখতে পারবেন।
আপনার রেজিস্ট্রেশন সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।

আপনার জন্য একটি একাউন্ট তৈরি হয়েছে। প্রদত্ত ইমেইল ও পাসওয়ার্ড দিয়ে লগইন করুন।

কোর্সের তারিখ: ০৩/১০/২০২৫
সময়: রাত ৯টা থেকে
(বাংলাদেশ সময়)

আপনার সঠিক - নাম, ইমেইল দিয়ে
Sign Up এ ক্লিক করুন।