বাংলাদেশী আমের রাজধানী কোনটি
বাংলাদেশী আমের রাজধানী কোনটি
ভূমিকা
আতুলনীয় স্বাদ আর অসাধারণ পুষ্টি গুণের কারণে, আমকে বলা হয় ফলের রাজা। সমগ্র পৃথিবীতে প্রতি বছর প্রায় ৬ কোটি টন আম উৎপাদিত হয়। বিশ্বের আম উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম। সরকারী হিসেবে দেশে প্রতি বছর প্রায় ২৫ লক্ষ টন আম উৎপাদিত হয়। যদি প্রশ্ন করা হয়, দেশের সবচেয়ে বেশি আম উৎপাদিত হয় কোথায়? তাহলে হয়ত সকলেই এক বাক্যে উত্তর দিবেন চাপাইনবাবগঞ্জ। কিন্তু গত এক দশকে চাপাইনবাবগঞ্জের পার্শ্ববর্তী জেলা নওগাঁ আম উৎপাদনে শীর্ষে চলে এসেছে। দুই জেলার আম উৎপাদনের পরিমাণে এত সামান্য হেরফের হয় যে, নিশ্চিত করে কোন এক জেলাকে বাংলাদেশের আম উৎপাদনের রাজধানী বলা যায় না। এছাড়া বিগত কয়েক বছরে সাতক্ষিরা এবং খাগড়াছড়ির মত জেলাতেও বিপুল পরিমাণ আম বানিজ্যিকভাবে উৎপাদিত হচ্ছে।
আম উৎপাদন ও বাজার ব্যবস্থা
বাগানে আম উৎপাদন থেকে শুরু করে ভোক্তা পর্যন্ত আসতে বেশ কয়েকটি ধাপ অতিক্রম করে। ধাপগুলো হল: ১. বাগান মালিক ২. বাগান ইজারাদার ৩. আড়ৎদার ৪. পাইকারী ব্যবসায়ী ৫.খুচরা ব্যবসায়ী এবং সবশেষে ৬.ভোক্তা। প্রথমধাপে বাগান মালিক আম গাছে মুকুল আসার আগে অথবা পরে তার বাগান ইজারা দিয়ে দেয়। কোন কোন বাগান মালিক নিজেও তার বাগানের পরিচর্যা করে থাকেন। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ইজারা গ্রহণকারীদের অধীনে স্থানীয় চাষীরা আম বাগানের মূল পরিচর্যা করে, আম ফলানোর কাজটি করে থাকেন। এরপর গাছে আম আসার পর বেশ কয়েক ধাপে আমগুলো বিক্রি হয়। কোন কোন পাইকারি ক্রেতা সরাসরি বাগান থেকে আম কিনে নেন। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাগান মালিক বা ইজারদাররা আমগুলো গাছ থেকে সংগ্রহ করে স্থানীয় আড়ৎ বা আমের বাজারে নিয়ে যান। চাপাইনবাবগঞ্জের কানসাট বা রাজশাহীর বানেশ্বর এরকম হাটের মধ্যে সর্ববৃহৎ। আড়ৎ বা হাট থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পাইকারি বিক্রেতারা এসব আম কিনে সারা দেশে ছড়িয়ে দেন। তারপর খুচরা বিক্রেতারা আমগুলো পাইকারদের কাছ থেকে কিনে সাধারণ ভোক্তা পর্যায়ে আম বিক্রি করে। বাগান থেকে ভোক্তা পর্যায়ে পৌছাতে এতগুলো হাত ঘোরার কারণে ২০ থেকে ৩০ টাকা কেজির আম সাধারণ মানুষকে কেজি প্রতি ৫০ থেকে ৮০ টাকা দামে কিনতে হয়। এই সরবরাহ প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি লাভবান হয় আড়ৎদার, পাইকার এবং খুচরা ব্যবসায়ীরা। কারণ বাগান মালিক, ইজারাদার বা চাষীরা খুব সামান্য দামে আড়ৎদােরর কাছে আম বিক্রি করেন। এছাড়া আম বাগান মালিক এবং চাষীরা ওজন নিয়ে বিড়ম্বনায় পড়েন। যতগুলো আমের বাজার আছে, প্রায় সবগুলোতেই ৪০ কেজির উপরে মণ ধরা হয়। কোনো কোনো বাজারে ৪৫-৫২ কেজিতে এক মণ ধরেন ব্যবসায়ীরা। এর অবশ্য আরেকটি কারণ হল, আম পরিবহনের সময় ওজন কিছুটা কমে যায়। সেকারণে ব্যবসায়ীরা আগে থেকেই বেশি করে আম নিয়ে নেন। বর্তমান সময়ে অনলাইন শপ বা ফেসবুক পেজের মাধ্যমেও প্রচুর আম বিক্রি চলছে। এসব ক্ষুদ্র থেকে মাঝারি উদ্যোক্তাদের অনেকেই আবার সরাসরি বিভিন্ন বাগান থেকে আম সংগ্রহ করে ভোক্তা পর্যায়ে পৌছে দিচ্ছেন। তাদের মাঝে খুব বেশি মধ্যসত্ত্বভোগী না থাকা সত্ত্বেও অনলাইন থেকে কেনা আমের দাম, বাজারের চেয়ে অনেক বেশি হয়ে থাকে। সেকারণে সাধারণ ভোক্তারা অনলাইন বা অফলাইন যেভাবেই আম কিনুক না কেন, তারা খুব বেশি সাশ্রয় করতে পারে না।
আমের রাজধানী চাপাইনবাবগঞ্জ
কৃষি বিভাগ বলছে, দেশে উৎপাদিত আমের ৬০ ভাগ হয় চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ রাজশাহী ও নাটোরে। এই চার জেলার মধ্যে ইতিহাস ও ঐতিহ্য কিংবা উৎপাদনের বিচারে আমের আঁতুড়ঘর বলা হয় চাঁপাইনবাবগঞ্জকে। বাংলাদেশে এক সময় শুধু চাঁপাইনবাবগঞ্জেই আমের বাণিজ্যিক চাষ হতো। এরপর রাজশাহী অঞ্চলের অন্যান্য জেলাগুলোতে আমের চাষ হতে শুরু করে। দেশে প্রায় ৮০০ জাতের আম হয়। এর মধ্যে শুধু চাঁপাইনবাবগঞ্জেই প্রায় ৩৫০ ধরনের জাতের আমের চাষ হয়। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কৃষিসম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, জেলায় এবার ৩৭ হাজার ১৬৫ হেক্টর জমিতে আম চাষাবাদ করা হচ্ছে। এসব জমিতে গাছের সংখ্যা ৩১ লাখ ৩৭ হাজার ৪০টি। চলতি আম মৌসুমে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪ লাখ ২৫ হাজার মেট্রিক টন। এই পরিমাণ আম থেকে প্রায় ২ হাজার ৪০০ কোটি টাকা বাণিজ্যের আশা করা হচ্ছে। যা গত বছরের তুলনায় প্রায় সাড়ে ৭০০ কোটি টাকা বেশি। চলতি বছর বৃষ্টি কম হওয়ায় তীব্র খরার কবলে পড়েছে রাজশাহী অঞ্চলের আম। সেকারণে আমের আকার তুলনামূলকভাবে ছোট হয়েছে। গত বছর যে আকারের আম মাঝারি হিসেবে ধরা হয়েছে, সেগুলোই এবারের সবচেয়ে বড় আম। তবে প্রতিকূল আবহাওয়া সত্ত্বেও চাপাইনবাবগঞ্জে এবার আমের বাম্পার ফলন হয়েছে।
আমের নতুন রাজধানী নওগাঁ
বানিজ্যিকভাবে ব্যাপক আম চাষের জন্য দীর্ঘ দিন থেকেই আমের রাজধানী হিসেব চাপাইনবাবগঞ্জের খ্যাতি ছিল। তবে চাপাইনবাবগঞ্জের সেই তকমায় ভাগ বসিয়েছে এর পার্শ্ববর্তী জেলা নওগাঁ। ক্রমবর্ধমান উন্নত জাতের আম বাগান এবং ব্যাপক ফলনের কারণে নওগাঁ ইতোমধ্যেই আমের নতুন রাজধানী হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। নওগাঁ ছিল ধানের জন্য বিখ্যাত। এই জেলার যেদিকে চোখ যায় সেদিকেই দেখা যেত শুধু ধানক্ষেত। কিন্ত ২০০৯ সাল থেকে নওগাঁয় শুরু হয়েছে আমের বিপ্লব। তখন েথকে জেলার আনাচে-কানাচে অসংখ্য আমবাগান গড়ে উঠছে। প্রথম দিকে ধানের জমিতে বাড়তি ফসল হিসেবে আমের চাষ জনপ্রিয় হয়ে উঠছিল। এঁটেল মাটি হওয়ায় এই এলাকার আম বেশ সুস্বাদু হত। সেকারণে অনেকেই নওগাঁর আমকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম বলে বিক্রি করত। নওগাঁর আম চাষীরা লক্ষ্য করেন, ধানের তুলনায় আমে লাভ বেশি। এ কারণে জেলা জুড়ে আমবাগান করার প্রবণতা বাড়তে থাকে। নওগাঁয় এক বিঘা জমিতে ধান আবাদ করে এক মৌসুমে ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা লাভ হয়। অন্যদিকে সমপরিমাণ জমিতে আমের চাষ করলে ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা অনায়াসে মুনাফা করা যায়। ফলে নওগাঁর সাপাহার, পত্নীতলা, পোরশা, নিয়ামতপুর উপজেলাসহ জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছোট ছোট আমের রাজত্ব গড়ে উঠতে থাকে। একটা পর্যায়ে নওগাঁয় আমের উৎপাদন চাপাইনবাবগঞ্জকেও ছাড়িয়ে যায়। নওগাঁর প্রধান আম হচ্ছে আম্রপালি। এই আমের ওপর ভিত্তি করেই নওগাঁ ব্যান্ডিং হয়েছে। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, নওগাঁয় অন্তত ৪৬ হাজার হেক্টর জমিতে আম চাষের সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে নওগাঁয় দেশের সবচেয়ে বড় আমের বাজার গড়ে ওঠার সম্ভাবনা আছে। চলতি মৌসুমে নওগাঁয় উৎপাদিত আম থেকে প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বানিজ্যের সম্ভাবনা রয়েছে। কৃষিসম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে বর্তমানে চাপাইনবাবগঞ্জ এবং নওগাঁর আমের উৎপাদন প্রায় সমান সমান। আম উৎপাদনের সামান্য হেরফের হলেই এক জেলা আরেক জেলাকে ছাড়িয়ে যায়। সেকারণে কোন জেলাকে এককভাবে আমের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া যায় না।
আম চাষের বিস্তার
আম উৎপাদনে যে জেলাই শীর্ষে থাকুক না কেন, সমগ্র দেশ জুড়েই যে আমের বাণিজ্যিক বাগান ছড়িয়ে পড়ছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। বানিজ্যিক আমবাগান দেশের কৃষি অর্থনীতির চেহারা বদলে দিচ্ছে। রাজশাহী অঞ্চলের বাইরে দক্ষিণ অঞ্চলের জেলা সাতক্ষিরায় বানিজ্যিক আম বাগান অনেক বেড়েছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে জেলার ৪ হাজার ১১৫ হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়েছে। সাতক্ষিরায় সরকারি তালিকাভুক্ত ৫ হাজার ২৯৯টি আমবাগান রয়েছে। এসব বাগান থেকে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৫ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন। অন্যদিকে পর্বত্য জেলা খাগড়াছড়িতেও আম চাষের পরিধি বাড়ছে। এখানে প্রতিবছরই নতুন নতুন বাগান গড়ে উঠছে। অনুকূল আবহাওয়া ও পাহাড়ের মাটি আম চাষের উপযোগী হওয়ায় স্থানীয় অনেকেই আম চাষের প্রতি গুরুত্ব দিচ্ছেন। বর্তমানে খাগড়াছড়ি জেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ১০ হাজার আম বাগান রয়েছে। সেকারণে অনেকেই খাগড়াছড়িকে আমের নতুন রাজধানী হিসেবে দেখছে।
আম রপ্তানি
বিশ্বে আম উৎপাদনে বাংলাদেশ সপ্তম অবস্থানে থাকলেও, আম রপ্তানির দিক থেকে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। কৃষি মন্ত্রনালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়, দেশের চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানি কম হওয়া স্বাভাবিক। তবে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ আম নষ্টও হচ্ছে। দেশে ২৫ লাখ টন আম উৎপাদন হলেও মাত্র ১ হাজার ৬০০ টন আম রফতানি হয়। তবে এ বছর প্রায় ৪ থেকে ১০ হাজার টন অাম রপ্তানির আশা করছে সরকার। যা গত বছরের তুলনায় অনেক গুণ বেশি। দেশের আম রপ্তানি বাড়ানোর জন্য কৃষি মন্ত্রনালয়ের পক্ষ থেকে ১৫ টি জেলার ৪৬ টি উপজেলায় রপ্তানি যোগ্য আম উৎপাদন কর্মশালার আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়া প্রযুক্তি নির্ভর কৃষি চর্চা এবং আমের ৫টি জাতের প্রডাক্ট প্রোফাইল তৈরীরও পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। রপ্তানির উপযোগী করে আম প্যাকেজিং করার উদ্দেশ্যে সম্প্রতি ঢাকার শ্যামপুরে কেন্দ্রীয় প্যাকেজিং হাউজ উদ্বোধন করা হয়েছে। রপ্তানিকারকরা জানিয়েছেন রপ্তানিযোগ্য আমের আবাদ বৃদ্ধি, আধুনিক বাগান ব্যবস্থাপনা এবং নতুন বাজার সৃষ্টির ফলে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আম রপ্তানি বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ থেকে আকাশপথের ভাড়া বাদে কেজিপ্রতি আম রপ্তানি করা হয় ১৫০ টাকা থেকে ১৬০ টাকায়। গত অর্থবছরে খিরসাপাত, হিমসাগর, গোপালভোগ, লেংড়া, আম্রপালি সহ সাত জাতের আম রপ্তানি হয়েছে। এগ্রি-প্রোডাক্ট হিসেবে আম রপ্তানিতে সরকার ২০ শতাংশ নগদ প্রণোদনা দেয় রপ্তানিকারকদের। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, আম রপ্তানির জন্য উত্তম কৃষি ব্যবস্থাপনা সার্টিফায়েড আম বাগান না থাকার কারণে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আম রপ্তানির পরিমাণ বাড়ানো যাচ্ছে না। বাংলাদেশে সার্টিফায়েড আম বাগান তৈরী করতে পারলে আম রপ্তানির পরিমাণ আরো বাড়ানো যাবে। বর্তমানে ১৫টির অধিক দেশে আম রপ্তানি হচ্ছে; যার মধ্যে রয়েছে ভুটান, নেপাল, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, গ্রেট ব্রিটেন, পর্তুগাল, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, সোয়াজিল্যান্ড সহ বেশ কিছু দেশ। এছাড়া ২০২০ সাল থেকে নওগাঁর আম্রপালি যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত কোম্পানি ওয়ালমার্টের চাহিদার তালিকায় রয়েছে।