টাইটান সাবমারসিবল

maxresdefault (72)
জীবনযাপন

টাইটান সাবমারসিবল

ওশানগেট নামের একটি কম্পানি পরিচালিত, টাইটান নামের একটি ডুবোযান নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তুলেছে। পাঁচজন যাত্রী নিয়ে সাবমারসিবলটি টাইটানিক জাহাজের ধ্বংসাবশেষ দেখতে গিয়েছিল। এই ভ্রমণের জন্য জনপ্রতি খরচ করতে হয় আড়াই লাখ ডলার; বাংলাদেশী টাকায় যার মূল্য প্রায় দুই কোটি ৭০ লাখ টাকা। টাইটানের শেষ যাত্রীরা হলেন ৬১ বছর বয়সী স্টকটন রাশ, তিনি ওশানগেট কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, ৪৮ বছর বয়সী ব্রিটিশ পাকিস্তানি ধনাঢ্য ব্যবসায়ী শাহজাদা দাউদ, তার ১৯ বছরের ছেলে সুলেমান দাউদ এবং ৫৮ বছর বয়সী ব্রিটিশ ধনকুবের ব্যবসায়ী হ্যামিশ হার্ডিং। এছাড়া ডুবোযানটির পাইলট হিসেবে ছিলেন ৭৭ বছর বয়সী পল-অঁরি নারজিওলেট। তিনি ফরাসি সাবেক নৌবাহিনীর ডুবুরি এবং খ্যাতনামা অভিযাত্রী।

টাইটান ডুবোযান ধ্বংস হল কিভাবে?

টাইটান সাবমেরিন নয় কেন?

ছোট্ট এই ডুবোযানকে সবাই সাবমেরিন বলছে। কিন্তু টাইটান মূলত একটি সাবমারসিবল। সাবমেরিন এবং সাবমারসিবলের মধ্যে মৌলিক কিছু পার্থক্য আছে। যেসব জলযানে নিজস্ব পাওয়ার সিস্টেম ও এয়ার রিনিউয়াল সিস্টেম থাকে এবং সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে পানির নিচে বিচরণ করতে পারে, সেগুলোকে সাবমেরিন বলে। অন্যদিকে যে সমস্ত জলযান বড় কোন জলযানের সাহায্য ছাড়া পানির নিচে চলতে পারে না, সেগুলোকে সাবমারসিবল বলা হয়। সাবমারসিবল আবার মোটাদাগে দুই ধরনের হয়ে থাকে, একধরনের সাবমারসিবলে কে বলে ১. Human-Occupied Vehicles বা (HOVs) এবং আরেকটি ধরন হল ২.  Remotely Operated Vehicles বা (ROVs)। Human-Occupied সাবমারসিবলে মানুষ চড়তে পারে। এবং Remotely Operated সাবমারসিবলগুলো হয় মনুষ্য বিহীন। বিভিন্ন ধরনের প্রয়োজন অনুযায়ী এসব সাবমারসিবল নকশা করা হয়। সাধারণত সমুদ্রবিদ্য, সাগর তলের প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা, মহাসাগর অনুসন্ধান, এডভেঞ্চার এবং আন্ডার ওয়াটার ভিডিওগ্রাফির জন্য সাবমারসিবল ব্যবহৃত হয়।

টাইটানের ভেতরে কেমন?

বর্তমান সময়ের আলোচিত ওশানগেট টাইটান সাবমারসিবলটি পোলার প্রিন্স নামের একটি আইসব্রেকার বা সামুদ্রিক বরফভাঙা জাহাজ থেকে লঞ্চ করা হয়। জাহাজ থেকে একটি প্লাটফর্ম সাবমারসিবলটিকে সমুদ্রের নির্দিষ্ট গভীরতা পর্যন্ত নামিয়ে দেয়। এরপর টাইটান মাতৃজাহাজের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে সমুদ্রের নিচ গিয়ে তার ভ্রমণ সম্পন্ন করে। ওশানগেট টাইটানের দৈর্ঘ ২২ ফুট, প্রস্থ ৯.২ ফুট এবং উচ্চতা ৮.৩ ফুট। একটি সাধারণ জাহাজের তুলনায় এটি অনেক ছোট। টাইটানকে বরংএকটি মাইক্রোবাসের সাথে তুলনা করা যায়। ছোট্ট এই ডুবোযানে একজন পাইলট এবং চার জন যাত্রী সহ মোট ৫ জন মানুষ আরোহণ করতে পারে। টাইটানে ভ্রমণ করতে সাধারণত ৮ ঘন্টা সময় লাগে। মোটামুটি বেশ দীর্ঘ সময় অবস্থান করতে হলেও, এর ভেতর ৫ জন মানুষ নড়াচড়া করার মত তেমন জায়গা নেই।

যানটি চালানোর জন্য শুধু দুটি মনিটর এবং একটি কন্ট্রোলার আছে। এছাড়া টাইটানের ভেতরে আর তেমন কিছুই নেই। এই সাবমারসিবলটি একটি সাধারণ ভিডিওগেম খেলার জয়স্টিক দিয়ে চালানো হয়। প্রযুক্তিগত দিক থেকেও যন্ত্রটি খুব বেশি উন্নত নয়। সাবমারসিবলটি উপরে নিচে এবং ডানে বামে পরিচালনা করার জন্য এর বাইরের দিকে চারটি ইলেকট্রিক থ্রাস্ট আছে। ওশান গেট টাইটানের সামনের এক কোনায় পর্দা ঘেরা ছোট্ট একটি টয়লেট আছে। ডুবোযানটির পেছনের দিকে রয়েছে বাকি যন্ত্রপাতি এবং অক্সিজেন ট্যাংক। কেবিনের ভেতরে উৎপন্ন কার্বন ডাই অক্সাইড রিসাইকেল করে ৫০ শতাংশ অক্সিজেন আবার কেবিনে ফিরিয়ে দেয়ার মত একটি যন্ত্রও রয়েছে। সেকারণেই ওশানগেট কম্পানি দাবি করে, সাবমারসিবলটিতে ৯৬ ঘন্টার অক্সিজেন মজুদ থাকে। টাইটান সাবমারসিবলটি তার পূর্ণ সক্ষমতায় প্রতি ঘন্টায় ২.৩ মাইল বেগে পানির নিচে নামতে পারে। এবং সর্বোচ্চ ১৩ হাজার ফিট বা ৪ কিলোমিটার পানির নিচ পর্যন্ত যেতে পারে। 

টাইটানের শেষ পরিণতি

টাইটানের প্রধান উদ্দেশ্য হল, পর্যটকদের নিয়ে টাইটানিকের ধ্বংসাবশেষের উপর দিয়ে ভ্রমণ করা। এখনও পর্যন্ত খুব কম লোকই এই দৃশ্য নিজ চোখে দেখতে পেরেছে। সর্বশেষ যাত্রায় টাইটানও টাইটানিকের ভাগ্য বরণ করেছে। পাঁচজন যাত্রী নিয়ে ডুবোযান টাইটান রওনা দেয়ার এক ঘণ্টা ৪৫ মিনিটের মধ্যে মাতৃজাহাজের সাথে তার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এই ঘটনার আট ঘণ্টা পর মার্কিন উপকূল রক্ষীদের বিষয়টি জানানো হয়। তারপর থেকে শুরু হয় এক বিশাল উদ্ধার অভিযান, পরবর্তীতে ক্যানাডিয়ান এবং ফরাসিরাও মার্কিন বাহিনীর সাথে উদ্ধার তৎপরতায় যোগ দেয়।

ঠিক কি কারণে ডুবোযানটি ধ্বংস হয়ে গেল সে বিষয়ে আসলে নিশ্চিত করে কিছু বলা যায় না। তবে গবেষকেরা বেশ কয়েকটি সম্ভাব্য বিষয় ধারণা করেছেন। প্রথম সম্ভাব্য কারণ হল, টাইটান হয়ত নিয়মিত টাইটানিক পর্যবেক্ষণের সময় ধ্বংস প্রাপ্ত জাহাজের সাথে ধাক্কা লেগে বিষ্ফোরিত হতে পারে। দ্বিতীয় সম্ভাব্য কারণ হল, যন্ত্রটির ব্যাটারি বিকল হয়ে, নিয়ন্ত্রন হারাতে পারে। তৃতীয় কারণ, সাগরের এত গভীরে পানির অনেক চাপ থাকে। পানির প্রচণ্ড চাপে ডুবোযান দুমড়ে মুচড়ে যাওয়াকে বলে ইমপ্লোশন। টাইটানের ভাগ্যে সেটি ঘটার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। চতুর্থ সম্ভাব্য কারণ হল, সাবমারসিবলে থাকা একমাত্র কাঁচের জানালাটি ভেঙে এর ভেতরে পানি ঢুকে যেতে পারে। পঞ্চম কারণ, সাবমারসিবলটি মাতৃজাহাজের সাথে সোনার সিস্টেমের সাহায্যে যুক্ত থাকে। অনকেই ধারণা করছেন টাইটান তার সাগরতলে অর্ধেক যাত্রা করার সময়েই মাতৃজাহাজের সাথে তার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এই যন্ত্রের নিজস্ব কোন নেভিগেশন সিস্টেম না থাকার কারণে এটি যে কোন ধরনের দুর্ঘটনায় জড়িয়ে পড়তে পারে। অনেকে আবার ধারণা করছেন, এটি হয়ত সাগর তলের ভ্রমণ শেষে আবার উপরেও উঠতে পারে, কিন্ত এটি ভেতর থেকে খোলার কোন ব্যবস্থা নেই। আরোহীদেরকে বাইরে বের করতে দরজাটি একমাত্র বাইরের দিক থেকেই খোলা যায়। তারা যেহেতে উদ্ধারকারীদের সাথে যোগাযোগ করতে পারেনি, তাই এটি  খুলে তাদের কে উদ্ধার করাও সম্ভব হয়নি।

কিন্তু বেশ কিছু রিপোর্ট থেকে জানা যায়, ওই এলাকায় একটি বিষ্ফোরণের শব্দ পাওয়া গিয়েছিল। এ থেকে ধারণা করা হয়, সাবমারসিবলটি হয়ত ভেতর থেকে বিষ্ফোরিত হয়ে ৫ টুকরো হয়ে গেছে। যার ধ্বংসাবশেষ টাইটানিক থেকে মাত্র ১৬০০ ফুট দূরে পড়ে ছিল।

Leave your thought here

Your email address will not be published. Required fields are marked *


দিন
ঘণ্টা
মিনিট
সেকেন্ড
আমাদের লাইভ ক্লাস শেষ হয়েছে, তবে আপনি এখন ফ্রি রেকর্ডেড কোর্সে ইনরোল করে দেখতে পারবেন।
আপনার রেজিস্ট্রেশন সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।

আপনার জন্য একটি একাউন্ট তৈরি হয়েছে। প্রদত্ত ইমেইল ও পাসওয়ার্ড দিয়ে লগইন করুন।

কোর্সের তারিখ: ০৩/১০/২০২৫
সময়: রাত ৯টা থেকে
(বাংলাদেশ সময়)

আপনার সঠিক - নাম, ইমেইল দিয়ে
Sign Up এ ক্লিক করুন।