চীনে একের পর এক মসিজদ ধ্বংস করা হচ্ছে কেন
চীনে একের পর এক মসিজদ ধ্বংস করা হচ্ছে কেন
ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতি চীন সরকারের আগ্রাসন নতুন কিছু নয়। দেশটিতে মুসলিম জনগোষ্ঠীর উপর বহু আগে থেকেই সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় ঘৃণ্য সব অত্যাচার চালানো হচ্ছে। তারই একটি নিয়মিত অংশ হল চীনের মসজিদ গুলোকে ধ্বংস করে ফেলা। সাম্প্রতিক সময়ে চীনের একটি মসজিদ ভাঙাকে কেন্দ্র করে, নতুন করে অস্থিরতার তৈরী হয়েছে। শি জিন পিনের ধর্ম বিরোধী নীতির কারনে, চীনের মুসলিমরা তাদের ইতিহাস এবং সংস্কৃতি সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলছে।
চীনের ইউনান প্রদেশের ইসলামি সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র নাগু শহর। এই শহরের নাজিয়াইং এলাকা হুই সম্প্রদায়ের ঐতিহাসিক বাসস্থান। হুই সম্প্রদায় প্রধাণত চীনের মুসলিম নৃগোষ্ঠী। তাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বিখ্যাত একটি স্থাপনা হল নাজিয়াইং মসজিদ। বিগত চতুর্দশ শতাব্দীতে এই মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছিল। কিন্তু চীন সরকার এই মসজিদটির কিছু অংশ বিশেষ করে মসজিদের গম্বুজ ভেঙে ফেলতে চায়। ২০২০ সালে চীনের একটি আদালত ঘোষণা করে যে, মসজিদের নতুন নির্মিত বেশ কিছু অংশ অবৈধ। এই রায়ের মাধ্যমে আসলে মসজিদের গম্বুজ এবং মিনারগুলোকে ভেঙে ফেলার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। এর জন্য প্রকৃত পক্ষে কোন যুক্তিই নেই। মসজিদের মিনার গুলো এত বেশি উঁচুও নয় যে, এগুলো এয়ারস্পেসে কোন ধরনের সমস্যা করবে; এমনকি এর আশে পাশে কোন বিমান বন্দরও নেই। তাহলে এই গম্বুজ আর মিনার কিধরনের অবৈধ স্থাপনা হল, তা কারো কাছেই বোধগম্য নয়। চীনা কর্তৃপক্ষ বলে, এই মসজিদের গম্বুজ এবং মিনারগুলো অবৈধভাবে নির্মাণ করা হয়েছে। তাই মসজিদটি ভেঙে ফেলা হবে।
আদালতের মাধ্যমে মসজিদকে অবৈধ ঘোষণা করে, চীন তাদের ঘৃণ্য প্রশাসনিক রূপের বহিঃপ্রকার করেছে। এটি তাদের মসজিদ ভাঙার জন্য একটি অযুহাত মাত্র। তবে চীনে মসজিদ ভাঙা মোটেও নতুন কিছু নয়। চীন সরকার বহু বছর ধরেই দেশটির সকল ধর্মীয় কাঠামো ভেঙে ফেলতে চাচ্ছে। চীনের ইউনান প্রদেশে মসজিদ ভাঙার কর্মযজ্ঞ সাম্প্রতিক সময়ে শুরু হলেও, জিনজিংয়াং প্রদেশের মসজিদগুলো ইতোমধ্যে নিশ্চিহ্ণ হবার পথে। জিনজিয়াং হল চীনের সবচেয়ে নির্যাতিত উইঘুর মুসলিম জনগোষ্ঠীর বাসস্থান। জিনজিয়াং প্রদেশে ২০১৭ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে অসংখ্য মসজিদকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। উইঘুর মানবাধিকার প্রকল্পের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, এখনও পর্যন্ত চীন সরকার প্রায় ৭৫ হাজার মসজিদ ধ্বংস করেছে। ধ্বংসকৃত এসব মসজিদের জায়গায় এমনসব স্থাপনা নির্মান করা হয়েছে, যা মুসলিমদের জন্য অত্যন্ত অপমানজনক। একটি মসজিদের জায়গায় পাবলিক টয়লেট বানোনো হয়েছে, আরেকটি জায়গায় বসানো হয়েছে অর্ন্তবাস ফ্যাক্টরি। ২০১৯ সালে জিনজিয়াং প্রদেশের আজনা মসজিদ ধ্বংস করে, সেখানে মদের দোকান বসানো হয়েছে। চীন সরকার ইতোমধ্যে জিনজিয়াং প্রদেশের ৭০ শতাংশ মসজিদ ধ্বংস করেছে। জিনজিয়াং এ শুধু মসজিদই নয়, উইঘুরদের বাড়ি ঘর এমনকি সম্পূর্ণ এলাকা মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে।
জিনজিয়াং এর পরে তাদের ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নতুন ময়দান হয়ে উঠেছে ইউনান প্রদেশ। মাত্র কয়েক বছর আগেও ইউনানের নাগু শহরে হাজারের অধিক মসজিদ ছিল। বর্তমানে এখানেও মসজিদের সংখ্যা আশঙ্কাজনকহারে কমে এসেছে। ইতোমধ্যে ইউনান প্রদেশের ২০০টি মসজিদের গম্বুজ এবং মিনার ভেঙে ফেলা হয়েছে। যেসব মসজিদ অবশিষ্ট আছে নাজিয়াইং মসজিদ সেগুলো মধ্যে অন্যতম। এখন এই ঐতিহাসিক মসজিদটিও একই ধরনের হুমকির মুখে পড়েছে। এটি নিঃসন্দেহে ধর্মীয় হত্যাযজ্ঞ। চীন সরকার সংখ্যালঘুদের নিধনে সকল ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। এবং প্রতিবার তারা অতীতের চেয়েও অধিক জঘন্য কর্মকান্ড পরিচালনা করছে। চীনা কমিউনিস্ট পার্টি প্রকাশ্যেই দাবি করে তারা নাস্তিক। শি জিন পিন চীনকে নাস্তিক্যবাদী দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে চান। অতীতে চীন খ্রিষ্টান ধর্ম মুছে ফেলার জন্যও বহু পদক্ষেপ নিয়েছে। এমনকি চীনে অনলাইনে বাইবেল বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়া মোবাইল ফোনে ধর্মীয় সঙ্গীত থাকার কারণে বহু মুসলিমকে গ্রেফতার করা হয়েছে। শুধু তাই নয় জিনজিয়াং প্রদেশের পুরষদের দাড়ি রাখাও নিষেধ।
চীনে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সাথে এমন গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা নিয়মিত বিষয়ে পরিণত হলেও, তথাকথিত উন্নত বিশ্বের দেশগুলো এ বিষয়ে কথা বলার কোন প্রয়োজন মনে করছে না। মুসলিম জনগোষ্ঠীর সম্পূর্ণ ইতিহাস এবং সংস্কৃতি মুছে ফেলার চেষ্টা করা হলেও, মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোও কোন প্রতিবাদ করছে না। উল্টো তারা সবাই চীনের সাথে তাদের বানিজ্যিক স্বার্থ টিকিয়ে রাখার চেষ্টায় ব্যস্ত।