চিনের কৃত্রিম সূর্য

maxresdefault (71)
জীবনযাপন

চিনের কৃত্রিম সূর্য

বেশ কয়েকমাস আগে চীনের কৃত্রিম সূর্য হিসেবে একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছিল। ভিডিওটিতে দেখা যায় একটি গোলাকার আগুনের পিন্ড আকাশে উঠে যাচ্ছে। একই রকম আরেকটি ভিডিও প্রচার করে বলা হয়, চীন কৃত্রিম সূর্য তৈরী করে, রাতকে দিন বানিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু এর সবই আসলে ভূয়া। এগুলো মূলত চীনা রকেট উৎক্ষেপনের দৃশ্য, যা ভিডিওতে আগুনের বলের মত দেখাচ্ছে। তবে চীন যে কৃত্রিম সূর্য বানাচ্ছে না, তা কিন্তু নয়। চীনের নির্মানাধীন কৃত্রিম সূর্য আকাশে ছেড়ে দেওয়ার মত কোন বস্তু নয়। এটি মূলত একধরনের পারমানবিক শক্তি উৎপাদন কেন্দ্র। যা বর্তমান সময়ের প্রচরিত পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চেয়েও অনেক বেশি টেকসই এবং নিরাপদ জ্বালানী তৈরী করতে পারবে।

চীনের কৃত্রিম সূর্য আসলে কি ?

চীনের কৃত্রিম সূর্য EAST

বিশ্বের বহু দেশের বিজ্ঞানীরা টেকসই এবং নিরাপদ জ্বালানীর জন্য নানা ধরনের গবেষণা করছেন। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে অভাবনীয় একটি প্রকল্প হল চীনের কৃত্রিম সূর্য। একে কৃত্রিম সূর্য বলার কারণ হল, এই প্রকল্পের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে সূর্যের মত নিউক্লিয়ার ফিউশন বিক্রিয়া ঘটিয়ে শক্তি উৎপাদন করার চেষ্টা করা হচ্ছে। উচ্চাভিলাষী এই প্রকল্প সফল হলে এটি থেকে সূর্যের মত অফুরন্ত শক্তি উৎপাদন করা যাবে। চীনের হেফেই শহরে প্লাজমা ফিজিক্স ইনস্টিটিউটে এই গবেষণা চালানো হচ্ছে। চীনের কৃত্রিম সূর্য প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক নাম হল Experimental Advanced Superconducting Tokamak যা সংক্ষেপে EAST নামে পরিচিত। টোকামাক হল এমন এক ধরনের যন্ত্র যার ভেতরে ফিউশন বিক্রিয়া ঘটানো হয়। টোকামাকের ভেতর প্রচন্ড শক্তিশালী চৌম্বক থাকে, যা যন্ত্রটির ভেতর অভাবনীয় চাপ তৈরী করে। এই চাপের সাহায্যে প্লাজমাকে নিয়ন্ত্রন করা হয়। প্লাজমা হল এক ধরনের অধিক উত্তপ্ত বৈদ্যুতিক আধানযুক্ত গ্যাস। প্লাজমার বিশেষ বৈশিষ্টের কারণে একে পদার্থের চতুর্থ অবস্থাও বলা হয়। এই প্লাজমাই হবে কৃত্রিম সূর্যের জ্বালানী।

ফিউশন পাওয়ার

চিনের কৃত্রিম সূর্য বা EAST এর আসল উদ্দেশ্য হল ফিউশন পাওয়ার উৎপাদন করা। ফিউশন পাওয়ারকে বলা হয় অফুরন্ত শক্তির আধার। ফিউশন পাওয়ার উৎপাদন কেন কঠিন তা জানার আগে ফিশন পাওয়ার সম্পর্কে একটু আলোচনা করা যাক। বর্তমান সময়ের পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে ফিশন বিক্রিয়ার মাধ্যমে শক্তি উৎপাদন করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় ইউরেনিয়াম বা প্লুটোনিয়াম এর মত ভারি তেজষ্ক্রিয় পরমাণুকে ভেঙে শক্তি উৎপাদন করা হয়। কিন্তু এভাবে বিপুল শক্তির অপচয় হয় এবং বিক্রিয়ার ফলে দীর্ঘমেয়াদী তেজষ্ক্রিয় বর্জ্য উৎপন্ন হয়। পারমানবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদিত বর্জ্য বিশেষ নিরাপত্তার সাথে মাটির নিচে সংরক্ষণ করতে হয়। তারপরও এগুলো খুবই বিপদজনক। এসব সমস্যা সমাধানের জন্যই মূলত গবেষকেরা ফিউশন বিক্রিয়ার প্রতি আগ্রহী হয়েছেন। এই পদ্ধতিতে দুটি হালকা পারমাণুকে একত্রিত করার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ শক্তি উৎপাদন করা হয়। ফিউশনের জন্য হাইড্রোজেন এর অাইসোটোপ ডিউটেরিয়াম এবং ট্রিটিয়াম এর মত পরমানু নেওয়া হয়। ফিউশন বিক্রিয়ায় দীর্ঘমেয়াদী তেজষ্ক্রিয় বর্জ্য উৎপন্ন হয় না। কিন্তু সমস্যা হল, ফিউশন বিক্রিয়া সচল রাখার জন্য যে ধরনের চরম পরিবেশ দরকার, পৃথিবীতে এখনও পর্যন্ত কৃত্রিমভাবে সে অবস্থা সৃষ্টি করা সম্ভব হয়নি। আমাদের সূর্য সহ বড় বড় তারকারাজিতে প্রাকৃতিকভাবে ফিউশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শক্তি উৎপাদিত হয়। তারমানে পৃথিবীতে ফিউশন প্রক্রিয়া চলমান রাখার জন্যও লক্ষ কোটি ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রার দরকার হবে। চীনা গবেষকেরা বিগত প্রায় দুই দশকের গবেষণায় মাত্র কয়েক সেকেন্ডের জন্য এমন পরিবেশ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন।

চীনা প্রকল্পের উদ্দেশ্য

চীনের কৃত্রিম সূর্য প্রকল্পের মোটাদাগে দুইটি উদ্দেশ্য রয়েছে। প্রথমটি হল নিয়ন্ত্রিত নিউক্লিয়ার ফিউশন বিক্রিয়া ঘটানো এবং দ্বিতীয়টি হল, নিরাপদ এবং টেকসই শক্তির উৎস হিসেবে ফিউশন বিক্রিয়ার সম্ভাব্যতা যাচাই করা। আমাদের সূর্যের কেন্দ্রে যে ধরনের পরিবেশ বিরাজ করে, কৃত্রিমভাবে ঠিক সেরকম পরিস্থিতি তৈরীর চেষ্টা করাই এই গবেষণার প্রধান উদ্দেশ্য। যদি সূর্যের মত ফিউশন বিক্রিয়ার প্রক্রিয়া টিকিয়ে রাখা যায়, তাহলে তা থেকে বিপুল পরিমাণ শক্তি উৎপাদন করা সম্ভব হবে। নিয়ন্ত্রিত সফল নিউক্লিয়ার বিক্রিয়া ঘটাতে পারলে জ্বালানী খাতের এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। এর মাধ্যমে সমগ্র পৃথিবীর জন্য প্রয়োজনীয় Clean Energy বা সবুজ জ্বালানী সরবরাহ করা যাবে। তখন শক্তি উৎপাদন করতে গিয়ে গ্রীন হাউজ গ্যাস বা তেজষ্ক্রিয় বর্জ্য নিঃসরনের কোন ঝামেলা থাকবে না। এটিই হতে পারে পৃথিবীর ক্রমবর্ধমান জ্বালানী সমস্যার সর্বোৎকৃষ্ট সমাধান।

চীনের সফলতা

চীনের বিজ্ঞানীরা ২০০৬ সাল থেকে EAST পরিচালনা করে আসছেন। তারা এখনও পর্যন্ত প্রায় ১ লক্ষ ২০ হাজার বার পরীক্ষা চালিয়েছেন। EAST টোকামাক দিয়ে প্লাজমার তাপমাত্রা, স্থায়ীত্ব এবং ঘনত্ব বাড়ানোর ক্ষেত্রে অনেক অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করতে পেরেছেন চীনা বিজ্ঞানীরা। ২০১৭ সালে চীনের বিজ্ঞানীরা EAST এর প্লাজমায় ১০০ মিলিয়ন ডিগ্রী সেলসিয়াস বা ১০ কোটি ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রা অর্জন করতে সক্ষম হয়। এই সাফলে চীনারা কৃত্রিম সূর্যকে বাস্তবে রূপদানের প্রক্রিয়ায় আরো এক ধাপ এগিয়ে যায়। সেবার ১০১ সেকেন্ডের মত সময় তারা ১০ কোটি ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রা ধরে রাখতে পেরিছিল। পরবর্তীতে পরিচালিত সফল পরীক্ষা গুলোর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ফলাফল হল, ২০১৮ সালে তারা EAST এর ভেতর ৭০ মিলিয়ন ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রায় প্লাজমাকে একটানা ১৮ মিনিট স্থিতিশীল রাখতে সক্ষম হয়েছিল। এই পরীক্ষাটি যদিও সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি উদ্দেশ্যে চালানো হয়েছিল। সবশেষ ২০২৩ সালের এপ্রিলে তারা অতীতের সকল রেকর্ড ভেঙে ফেলে। এবার তারা একটানা ৪০৩ সেকেন্ড সূর্যের মত চরম তাপমাত্রা ধরে রাখতে সক্ষম হয়। একটি সফল স্থিতিশীল অপারেশন পরিচালনার জন্য ৩০০ সেকেন্ড হল নূন্যতম সময়। সে হিসেবে এবারের পদক্ষেপটি চীনের জন্য অনেক বড় অর্জন হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। EAST এর পরীক্ষা চালানোর পাশাপাশি চীন কৃত্রিম সূর্যের আরেকটি নতুন মডেল নিয়ে কাজ করছে। চীনের ভবিষ্যৎ সেই মডেলের নাম China Fusion Engineering Test Reactor যার সংক্ষিপ্ত নাম CFETR। এই নতুন মডেল দিয়ে ২০৩৫ সাল থেকে পরীক্ষা কার্যক্রম শুরু করা হবে।

ভিডিওর এই পর্যায়ে আমাদের স্পন্সর সম্পর্কে কিছু কথা বলা যাক,

আপনি কি চায়না থেকে পণ্য এনে ব্যবসা করতে চাচ্ছেন? চায়নার ২০ কোটি পণ্যের সমাহার নিয়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারী শ্রেনির ব্যবসায়ীদের জন্য পাইকারি মূল্যের সেরা মার্কেটপ্লেস, Skybuybd-তে রয়েছে LC এবং customs সংক্রান্ত ঝামেলা ছাড়াই শুধু মাত্র কেজি প্রতি খরচে চায়না থেকে পণ্য সোর্সিং-এর সুবিধা। ওয়েবসাইটে পণ্যের নাম লিখে অথবা ইমেজ সার্চের মাধ্যমে আপনার কাঙ্খিত পণ্য অর্ডার করলেই বাই এয়ারে স্বল্প সময়েই পণ্য পৌছে যাবে আপনার ঠিকানায়। পাশাপাশি ডেডিকেটেড কাস্টমার সাপোর্ট,ওয়েরহাউসিং ফেসিলিটি এবং প্রোডাক্ট ট্র্যাকিং এর সুবিধা তো রয়েছেই। তাই দেরি না করে আজই আপনার পছন্দের প্রোডাক্টটি অর্ডার করুন Skybuybd থেকে এবং ৫% ডিসকাউন্ট পেতে KKK5 কুপন কোডটি ব্যবহার করুন।

আবার মূল বিষয়ে ফিরে আসা যাক,

চ্যালেঞ্জ এবং সীমাবদ্ধতা

চীনের কৃত্রিম সূর্য প্রকল্পে এখনও পর্যন্ত অভাবনীয় সাফল্য আসলেও, এই মহাপ্রকল্প বাস্তবায়ন করতে আরো বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ এবং প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করতে হবে। এর প্রধান চ্যালেঞ্জ হল দীর্ঘ সময়ের জন্য প্লাজমার স্থিতিশীলতা ধরে রাখা। এছাড়া অতি উচ্চ তাপমাত্রা বজায় রাখা এবং তেজষ্ক্রিয়তা নিয়ন্ত্রণ করা আরেক ধরনের চ্যালেঞ্জ। তাছাড়া টোকামাকগুলোকে লক্ষ কোটি ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপ সহনশীল করে গড়ে তোলা মোটেও সহজ বিষয় নয়। শুধু তাই নয় এত উচ্চ তাপমাত্রা দীর্ঘ সময় বিরাজ করলে, টোকামাকের ভেতরের কাঠামো ঠিক রাখার মত উপাদান এখনও পাওয়া যায়নি। বিশাল এই সমস্যা সমাধানের জন্য চীন বিশ্বের বহু দেশের ফিউশন ইঞ্জিনিয়ারদের সাথে কাজ করছে। বেশ কয়েকটি দেশের বিজ্ঞানীরা মিলে ফ্রান্সে আরেকটি একই ধরনের প্রকল্প চলমান রয়েছে। এর নাম International Thermonuclear Experimental Reactor যাকে সংক্ষেপে ভলা হয় ITER প্রকল্প। চীনের বিজ্ঞানীরাও এই প্রকল্পে কাজ করছেন। এই প্রকল্পের উদ্দেশ্যই হল টেকসই এবং নিরাপদ ফিউশন বিক্রিয়া ঘটানোর জন্য বৈজ্ঞানিক এবং প্রকৌশলগত চ্যালেঞ্জ মেকাবেলা করা। শুধু চীন এবং ফ্রান্সই নয়, দক্ষিণ কোরিয়াও কৃত্রিম সূর্য তৈরীর চেষ্টা করছে। তাদের  প্রকল্পের নাম Korea Superconducting Tokamak Advanced Research বা KSTAR। গত বছর এই প্রকল্পের বিজ্ঞানীরা ৩০ সেকেন্ডের জন্য ১০০ মিলিয়ন ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রা অর্জন করতে পেরেছিল।  

প্রচলিত পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ঝুঁকি কমাতে এবং সহজে বিপুল পরিমাণ জ্বালানী পাওয়ার অাশায় বিশ্বের পরাশক্তিধর দেশগুলো চাঁদের মাটিতে অনুসন্ধান চালাচ্ছে। চাঁদের মাটিতে থাকা মহা মূল্যবান পদার্থের নাম হিলিয়াম-৩ দিয়ে এত পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাবে, যা দিয়ে পৃথিবী ১০ হাজার বছর চলতে পারবে। এই হিলিয়াম-৩ র খোঁজেই সাম্প্রতিক সময়ে, বিশ্বের বহু দেশ আবারো চাঁদে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

Leave your thought here

Your email address will not be published. Required fields are marked *


দিন
ঘণ্টা
মিনিট
সেকেন্ড
আমাদের লাইভ ক্লাস শেষ হয়েছে, তবে আপনি এখন ফ্রি রেকর্ডেড কোর্সে ইনরোল করে দেখতে পারবেন।
আপনার রেজিস্ট্রেশন সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।

আপনার জন্য একটি একাউন্ট তৈরি হয়েছে। প্রদত্ত ইমেইল ও পাসওয়ার্ড দিয়ে লগইন করুন।

কোর্সের তারিখ: ০৩/১০/২০২৫
সময়: রাত ৯টা থেকে
(বাংলাদেশ সময়)

আপনার সঠিক - নাম, ইমেইল দিয়ে
Sign Up এ ক্লিক করুন।