এপল ভিশন প্রো
এপল ভিশন প্রো
এপল ভিশন প্রো
এপল এর নতুন এক পন্য প্রযুক্তি বিশ্বে বেশ আলোড়ন তুলেছে। এর নাম এপল ভিশন প্রো। বিশেষ এই হেডসেট কল্পকাহিনীকে বাস্তবে পরিণত করার মত প্রযুক্তি সবার সামনে নিয়ে এসেছে। এপল বলছে এর মাধ্যমে The Era Of Spatial Computing বা স্থানিক কম্পিউটিং যুগের সূচনা হল। তারমানে এখন কম্পিউটার শুধু ভার্চুয়ার দুনিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং আপনার বাস্তব জগতের সাথে কম্পিউটারের এক অভূতপূর্ভ মেলবন্ধন ঘটবে। প্রযুক্তিবিদেরা ধারণা করছেন, এটিই হয়ত কম্পিউটিং এর ভবিষ্যত।
VisionOS
এপল ভিশন প্রো হেডসেট মাথায় পরার সাথে সাথে আপনি আপনার বাস্তব জগৎ এবং ভার্চুয়াল জগৎ এক সাথে দেখতে পারবেন। আপনার পছন্দের অ্যাপগুলো বাস্তবের মত চোখের সামনে ভেসে উঠবে। কম্পিউটারের ভেতরে থাকা উপাদানগুলোকে বাস্তব জগতের বস্তুর মতই ত্রিমাত্রিক ভাবে দেখতে পারবেন। এই বিষয়টি ঘটানোর জন্য VisionOS নামে সম্পূর্ণ নতুন একটি অপারেটিং সিস্টেম তৈরী করেছে এপল। এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হল, শুধু চোখের ইশারায় কম্পিউটার চালানো বা হাতের আঙ্গুলের ইশারায় কম্পিউটার নিয়ন্ত্রণ করা। এছাড়া ভয়েস এর সাহায্যে কমান্ড করার সুবিধা তো থাকছেই। VisionOS এর প্রতিটি অ্যাপের উইন্ডো এবং অ্যাপ ত্রিমাত্রিক অনুভূতি দেয়, এমনকি বাস্তবের মত এসব অ্যাপের ছায়াও পড়বে। এর সবই হবে ভিশন প্রো হেডসেটের ভেতর, কিন্তু মনে হবে তা আপনার সামনে বাস্তবে ঘটছে। ভিশন প্রো ব্যবহারের সময় যদি অন্য কেউ আপনার সামনে আসে, তাহলে তার সাথে যোগাযোগ করার জন্য যন্ত্রটি চোখ থেকে সরাতেও হবে না। ভিশন প্রো চোখে রেখেই স্বাভাবিকভাবে দেখতে বা কথা বলতে পারবেন। এই ডিভাইস মানুষের কম্পিউটার নির্ভর কাজের ক্ষেত্রেও অসাধারণ অভিজ্ঞতা দিবে।
ভিশন প্রো ডিসপ্লে
এপল ভিশন প্রো তে ডিসপ্লের কোন সীমারেখা নেই। আপনার যেভাবে খুশি সেভাবে ডিসপ্লেকে সাজাতে পারবেন। সিনেমা দেখার সময় ভিশন প্রো নিজে নিজেই চারপাশে সিনেমার মত আবহ তৈরী করবে। সিনেমার পর্দাকে যত বড় খুশি তত বড় করতে পারবেন। এর স্পেইশার অডিও এমনভাবে শব্দ প্রক্ষেপণের কাজ করবে, মনে হবে আপনি সেই অ্যাকশনের মধ্যেই আছেন। এই ডিভাইস দিয়ে ভিডিওগেম খেলার সময়ও মনে হবে, আপনি সত্যি সত্যি গেমের জগতে প্রবেশ করেছেন। ভিশন প্রোর সাহায্যে এপলের ল্যাপটপের স্ক্রিনকেও অনেক বড় করে দেখা যাবে। এখানেই শেষ নয়, চারপাশের পরিবেশ যদি পছন্দ না হয়, তাহলে এর সাহায্যে আপনার ইচ্ছে মত যে কোন দৃশ্য চোখের সামনে নিয়ে আসতে পারবেন।
ভিশন প্রো তে এপলের সর্বপ্রথম থ্রিডি ক্যামেরা যুক্ত করা হয়েছে। এর সাহায্যে যেকোন ছবি এবং ভিডিওকে অসাধারণ গভীরতার সাথে ক্যামেরা বন্দী করা যাবে। ডিভাইসটি দিয়ে আপনার চেহারার থ্রিডি ছবি তুলে রাখতে পারবেন। ভিডিও কলে কথা বলার সময় যেহেতু আপনার চোখ এই যন্ত্রে ঢাকা থাকবে, তাই তখন অপর প্রান্তে যারা আছে তারা আপনার ত্রিমাত্রিক ছবিটি দেখতে পারবে। এই ডিভাইসে থাকা বিভিন্ন উপাদান গুলোকেও সম্পূর্ণ থ্রিডিতে ব্যবহার করা যাবে। মনে হবে সত্যি সত্যি আপনি অন্য কোন ত্রিমাত্রিক দুনিয়ায় বিরাজ করছেন।
ভিশন প্রো কিভাবে কাজ করে
অসাধারণ এই প্রযুক্তি পণ্য গড়ে তোলার জন্য এপল বেশ কিছু অভাবনীয় প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে। এর বাইরের দিকে ব্যবহার করা হয়েছে লেমিনেটেড গ্লাস, যা ভিশন প্রোর লেন্স হিসেবে কাজ করে। হালকা এলিুমিনিয়াম এলয়ের ফ্রেম দিয়ে এর কাঠামো তৈরী করা হয়েছে। ভিশন প্রোর ডিসপ্লে তৈরী করার জন্য micro-OLED display system নামের নতুন এক ধরনের ডিসপ্লে প্রযুক্তি আবিষ্কার করা হয়েছে। এর সাহায্যে আইফোনের একটি পিক্সেলের সমান জায়গায় ৬৪টি পিক্সেল বসানো হয়েছে। ফলে দুটি পোস্টাল স্ট্যাম্পের সমান স্ক্রিনে ২ কোটি ৩০ লাখ পিক্সেল দেওয়া হয়েছে। যা একেক চোখের জন্য আলাদা আলাদা 4K TV এর চেয়েও বেশি স্পষ্ট ছবি তৈরী করতে পারে। ভিশন প্রোর আই ট্রাকিং এমনভাবে করা হয়েছে যে, স্ক্রিনে আপনি যে বিষয়টির দিকেই তাকাবেন, সেটিই সিলেক্ট হবে। চোখের ভাষা এবং হাতের ইশারা বোঝার জন্য ১২টি ক্যামেরা, ৬টি মাইক্রোফোন এবং ৫টি সেন্সর বসানো আছে। আপনি চোখ দিয়ে তাকিয়ে হাত দিয়ে সিলেক্ট বা স্ক্রল করতে চাইলে সেন্সরগুলো সাথে সাথে তা ধরে ফেলবে। সাউন্ডের জন্য এমন Spatial Audio সিস্টেম তৈরী করা হয়েছে, যা ঘরের মধ্যে থাকা অন্যসব উপাদান চিনতে পারে, এবং সেই অনুযায়ী বিশেষ শব্দ সরাসরি কানে পৌছে দেয়। ভিশন প্রোতে এমন ম্যাপিং প্রযুক্তি যুক্ত করা হয়েছে, যা ঘরের দেয়াল, আসবাবপত্র এমনকি মানুষকেও আলাদা করে সনাক্ত করতে পারে। এই বিষয়গুলোই ভিশন প্রোর অভিজ্ঞতাকে বাস্তবের মত নিঁখুত করে তোলে। এই নতুন অপারেটিং সিস্টেমে সেরা পারফর্মমেন্স দিতে dual-chip ব্যবহার করা হয়েছে। এর একটি ডিভাইসের মূল কাজগুলো করে এবং অন্যটি ডিভাইসের সেন্সর ডাটা নিয়ে কাজ করে। সেজন্যই ভিশন প্রো ব্যবহারের সময় কোন ধরনের বিলম্ব অনুভূত হবে না। সবকিছুই ঘটবে তাৎক্ষনিক। এই ডিভাইসের সাথে ব্যাটারি সংযুক্ত করলে অনেক ভারি হয়ে যেত, যা মাথায় রাখার জন্য আরামদায়ক হত না। সেজন্য আলাদা ব্যাটারি প্যাকের সাহায্যে ডিভাইসটি কানেক্ট করতে হয়। যা দিয়ে প্রায় দুই ঘন্টা ডিভাইসটি ব্যবহার করা যায়।
আলোচনা/সমালোচনা
এপল ভিশন প্রো সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে নেটিজেনরা দুইভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। একদল একে সবচেয়ে ফালতু এবং অপ্রোয়জনীয় ডিভাইস মনে করছেন। অন্যরা বলছেন, ভিশন প্রো হতে যাচ্ছে সবচেয়ে প্রভাবশালী প্রযুক্তি পন্যগুলোর একটি। তবে যারা ডিভাইসটি ব্যবহার করেছেন, তাদের অধিকাংশই বলছেন ভিশন প্রো অনেকটা জাদুর মত কাজ করে। এপল মনে করছে এটি মানুষের কম্পিউটার ব্যবহারের এক নতুন দিক উন্মোচন করবে। ভিশন প্রোর প্রথম সংস্করণকে আইফোন ওয়ান এর সাথে তুলনা করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি আরো বহু দূর এগিয়ে যাবে।
সত্যি কথা বলতে এপল ভিশন প্রো হল ভার্চুয়াল রিয়ালিটি বা ভিআর এবং অগমেন্টেড রিয়ালিটি বা এআর এর সম্মিলিত রুপ। দুটি প্রযুক্তির কোনটিই নতুন নয়; কিন্তু এপল ভিআর এবং এআর এর এত অসাধারণ মেলবন্ধন তৈরী করেছে, যা সত্যিই অকল্পনীয়। এর আগে যেসব ভার্চুয়াল রিয়ালিটি হেডসেট বাজারে এসেছিল সেগুলোতে শুধুমাত্র গেমিং বা বিনোদনের মত নির্দিষ্ট দু একটি কাজ করা যেত। একইভাবে প্রচলিত অগমেন্টেড রিয়ালিটি গ্লাস গুলোতে চারপাশের পরিবেশ হয় খুব ঘোলা, অথবা সাদাকালো দেখা যেত। কিন্তু এপল এই দুটি কাজই একটি ডিভাইস দিয়ে নিঁখুতভাবে করেছে। এ ধরনের ডিভাইস তৈরী করার জন্য এপল ২০১৭ সাল থেকেই চেষ্টা করে আসছিল। সেজন্য তারা বহু এআর এবং ভিআর কম্পানি থেকে এক্সপার্টদের নিয়োগ করেছে। এই পণ্য তৈরী করার জন্য এপল প্রায় ৫ হাজার পেটেন্ট করেছে।
এপল সাধারণত নতুন কোন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে না। তারা প্রচলিত প্রযুক্তির অসুবিধাগুলো সামাধান করার জন্যই সবচেয়ে বিখ্যাত। ১৯৮০ এর দশকে কম্পিউটারে টাইপিং করা বেশ ঝামেলার কাজ ছিল। তখন কম্পিউটার স্ক্রিনের নির্দিষ্ট জায়গায় কমান্ড দেওয়ার জন্য অনেক কষ্ট করতে হত। এপল ভাবল এটাকে সরাসরি পয়েন্ট এন্ড ক্লিক করলে কেমন হয়। সেই থেকেই সহজ ব্যবহার উপযোগী মাউসের যাত্রা শুরু। যদিও আইডিয়াটা এপল Xerox Park থেকে চুরি করেছিল। ২০০০ সালের দিকেও এপল দেখল হাতের মুঠোয় থাকা ক্ষুদে কম্পিউটারগুলো শুধুমাত্র বাটন দিয়ে নিয়ন্ত্রন করা অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে। তখন তারা ভাবল সরাসরি আঙ্গুল দিয়ে এটা নিয়ন্ত্রন করা গেলে কেমন হত। এপল তখন fingerworks নামের একটি কম্পানির আইডিয়া নিয়ে টাচস্ক্রিন ডিভাইস তৈরী করল। ২০১০ সালের দিকে এপল দেখল ভিআর হেডসেটগুলোর ইন্টারফেস খুব এলোমেলো এবং এগুলো নিয়ন্ত্রণ করা খুবই কঠিন। তখন তারা ভাবল আমাদের চোখ, হাত এসব দিয়ে আমরা যেমন যোগাযোগ করি, ঠিক সেভাবে যদি হেডসেটগুলো নিয়ন্ত্রন করা যায়, তাহলে কেমন হয়? এপল যেসব প্রযুক্তিতে সেরা করেছে তার কোনটিই তারা উদ্ভাবন করেনি। তারা অন্য কম্পািনর জন্য অপেক্ষা করেছে; অন্যরা ত্রুটি যুক্ত পণ্য তৈরী করেছে, তারপর এপল সেগুলোকে অনেক বেশি নিঁখুত করে বাজারে ছেড়েছে।
দাম এত বেশি কেন?
এপল ভিশন প্রোর দাম রাখা হয়েছে সাড়ে তিন হাজার ডলার। বাংলাদেশী টাকায় প্রায় তিন লাখ ৮০ হাজার টাকা। অনেকেই বলছে, এপল বরাবরের মতই মানুষের পকেট কাটার জন্য এত দাম রেখেছে। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এপল অন্যান্য পণ্যে দাম বেশি রাখলেও, এই ডিভাইসের তুলনায় দাম ঠিকই আছে। এ ধরনের জটিল যন্ত্র ডিজাইন করা এবং নিঁখুত করে তৈরী করা কোন সহজ বিষয় নয়। ভিশন প্রো তৈরী করতে দেড় হাজার ডলার বা এক লাখ ৬২ হাজার টাকার শুধুমাত্র যন্ত্রাংশই দরকার হয়েছে। এছাড়া এই ডিভাইসের জন্য আলাদা চিপ এবং কুলিং সিস্টেম তৈরী করা; সেই সাথে সম্পূর্ণ গবেষণা এবং উৎপাদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে কম্পানিটির শত শত বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে। তবে এপল ধারণা দিয়েছে, ভবিষ্যতে এর দাম আরো কমে আসবে।
এপলের আইফোনের চেয়ে ভিশন প্রোর চাহিদা হয়ত কমই থাকবে। তবে এই যন্ত্রটি মানুষের কম্পিউটার ব্যবহারের নতুন ধরনকে জনপ্রিয় করে তুলবে। এপল এই ধরনের পন্য তৈরী করার পর অন্যান্য কম্পানিগুলো বসে থাকবে না। আইফোনের বিপরীতে এন্ড্রয়েড এর যেমন একটি বিশাল ভোক্তা শ্রেণী গড়ে উঠেছে। ঠিক তেমনিভাবে এপল ভিশন ওএস কে টেক্কা দেওয়ার মত নিশ্চই কোন না কোন অপারেটিং সিস্টেম তৈরী হবে। এবং তা হয়ত সাধারণ মানুষ অনেক সস্তায় উপভোগ করতে পারবে। দশ বছর আগে আমরা যে প্রযুক্তি সম্পর্কে কল্পনাও করতে পারতাম না, তারচেয়েও অনেক বেশি কিছু আমরা আমাদের বর্তমান স্মার্টফোন দিয়ে করতে পারি। একই রকমভাবে নতুন ধরনের এই কম্পিউটিং আজকে আমাদের বিষ্ময় জাগালেও, দশ বছর পর নিশ্চই আমরা এর চেয়েও অনেক বেশি উন্নত যন্ত্র মাথায় নিয়ে ঘুরব।